বেড়েছে প্রবাসী-আয়, রপ্তানিও বাড়ছিল। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বড় অংশের বাস্তবায়নও শুরু হচ্ছিল। অভ্যন্তরীণ ভোগের ওপর নির্ভর করে
প্রবৃদ্ধিও ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে
যাবে বলে সরকারের প্রত্যাশা ছিল। মূল্যস্ফীতিও নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু সবকিছুই
ভেস্তে যেতে বসেছে চলমান সহিংসতার কারণে।
বিনিয়োগের স্থবিরতা অনেক দিন ধরেই। তার পরও প্রবৃদ্ধি বাড়ছিল ভোগ-ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু টানা হরতাল ও সহিংসতার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বাধা পড়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও সংকট বাড়ছে।
নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। প্রতি রাতে কারওয়ান বাজারে সবজিবাহী ১০০ থেকে ১৫০টি ট্রাক আসে। সেই ট্রাক আসা বন্ধ হয়ে গেছে। বাজারে ক্রেতা কম, সরবরাহও নেই। দাম বেড়ে গেছে সব ধরনের পণ্যের। সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির হিসাবে চাল ছাড়া প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের দামই বেড়েছে। অন্যদিকে কিছু কিছু দোকান খোলা থাকলেও বিক্রি অনেক কম। ফলে মুদি দোকানিদের ব্যবসাও প্রায় বন্ধ। কাজ পাচ্ছেন না দিনমজুরেরাও। ফলে সীমিত আয়ের এবং নিম্নবিত্ত ব্যক্তিরাই সবচেয়ে সংকটে পড়ে গেছেন হরতাল ও সহিংসতার ঘটনায়।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, হরতাল ও সহিংসতা দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়বে। তাহলে বিদ্যমান অস্থিরতা ও সহিংসতা হবে অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত।
হরতাল ও সহিংস ঘটনার কারণে অর্থনীতির ওপর তিনভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। প্রথমত, চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম ও যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় আমদানি-রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মূলধনি, মধ্যবর্তী ও কাঁচামাল আমদানি না হলে উৎপাদন ব্যাহত হবে। এতে রপ্তানি কমে যাবে। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। তৃতীয়ত, সহিংস ঘটনার কারণে রাস্তাঘাট, সেতুসহ রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে উন্নয়ন খাতের অর্থ স্থানান্তর করতে হবে, যা উন্নয়নের ধারাবাহিকতা টেনে ধরবে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, টানা হরতাল ও সহিংসতা অর্থনীতির জন্য শুধু উদ্বেগজনক নয়, শঙ্কাজনকও। এ ধরনের ঘটনা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিপর্যস্ত অর্থনীতি: ১৩ মাসের মধ্যে শেয়ারবাজারে সূচকের সর্বোচ্চ পতন হয়েছে গত রোববার। চট্টগ্রামের সমুদ্রবন্দরে আমদানি-রপ্তানির পণ্য আটকা পড়ে গেছে। ঢাকায় আসতে পারছে না কোনো কৃষিপণ্য। শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কাজ পাচ্ছেন না দৈনন্দিন মজুরেরা।
পর্যটনশিল্পও টানা সহিংসতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আটকা পড়েছেন পর্যটকেরা। আবার প্রচুর সাধারণ মানুষের সহায়-সম্পত্তি বিনষ্ট হয়েছে, আগুনে পুড়ে গেছে। এসব ক্ষেত্রে কোনো বিমা করা হয় না। ফলে চলতি খরচ বা সঞ্চয় ভেঙে ঘরবাড়ি তৈরি করতে হবে। এর ফলেও এসব মানুষের ভোগের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।
এমনিতেই তৈরি পোশাক খাত নিয়ে চলছে নানা সংকট। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিশেষ অগ্রাধিকারমূলক বাজার-সুবিধা বা জিএসপি বাতিলের হুমকির মধ্যে আছে। তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডে ১১১ জন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা এখনো সামাল দেওয়া যায়নি। পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের কারণে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের ফলে ভাবমূর্তির সংকটেও আছে দেশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন সংকট।
বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, চলমান সহিংসতায় ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত ও অসহায়। পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। পণ্যবাহী ট্রাক থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোথায় ট্রাক আটকা পড়ল, সারা দিন খোঁজ নিয়েও জানা যাচ্ছে না। চট্টগ্রামে পণ্য আটকা পড়ায় কনটেইনার-জট লেগে গেছে। সময়মতো পণ্য রপ্তানি করা যাবে কি না, তা বোঝা যাচ্ছে না। এ রকম এক অসহনীয় পরিবেশে রপ্তানির বাজার ধরে রাখা নিয়েই শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিজিএমইএর সভাপতি আরও বলেন, একটা দেশের অর্থনীতি এভাবে চলতে পারে না। রাজনীতি সব সময়ই অর্থনীতির পরিপূরক। সুতরাং, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে অর্থনীতিও চলবে না। এর অবসান হতে হবে।
স্থবির বিনিয়োগ: অর্থনীতির তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রায় সবগুলো সূচকই ছিল নিম্নমুখী। যেমন, চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) আমদানি ব্যয় কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ। অথচ আগের বছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১৭ শতাংশ।
আবার চলতি অর্থবছরের একই সময়ে নতুন ঋণপত্র (এলসি) স্থাপনা ও নিষ্পত্তি কমেছে যথাক্রমে সাড়ে ৬ শতাংশ ও প্রায় ১১ শতাংশ। নতুন এলসি স্থাপনার ক্ষেত্রে ভোগ্যপণ্য ও মূলধনি পণ্যের আমদানি বাড়লেও পেট্রোলিয়াম পণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, এলসি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ভোগ্যপণ্য, মূলধন পণ্য, পেট্রোলিয়াম এবং শিল্পের কাঁচামালের আমদানি কমে গেছে। এর মধ্যে মূলধন পণ্যে এলসি নিষ্পত্তি কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ এবং শিল্পের কাঁচামালে কমেছে সাড়ে ৫ শতাংশ। এ তথ্য থেকেও বিনিয়োগ স্থবিরতার একটি চিত্র পাওয়া যায়।
তবে রপ্তানির চিত্রটি ছিল তুলনামূলকভাবে ভালো। বিশেষ করে, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কারণে আশঙ্কার তুলনায় রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব কম। চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। আবার জানুয়ারি মাসেই রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১৯ শতাংশ। যদিও আগের বছরের একই সময়ে (জুলাই-জানুয়ারি) রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ দশমিক ২৮ শতাংশ।
অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কা: চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই সবচেয়ে দুর্বল জায়গা ছিল বিনিয়োগ। ব্যক্তি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটি বেশি প্রযোজ্য। গত ছয় মাসে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগসংক্রান্ত সব সূচকে প্রবৃদ্ধি কমেছে। যেমন, ব্যক্তি খাতে ঋণ ও আমদানি। এর প্রভাব হিসেবে সাধারণভাবে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমার যে আশঙ্কা ছিল, সেটি এখন আরও জোরদার হচ্ছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ গবেষক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সামগ্রিক বিষয় নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, এ রকম এক পরিস্থিতির ভেতরে যদি ধারাবাহিকভাবে সবকিছু বন্ধ থাকে, তাহলে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে উৎপাদকেরা পণ্য বিক্রি করতে পারবেন না, অথচ ক্রেতাদের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এতে উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই সময়ে যদি আবার কাপড়ভর্তি ট্রাক পুড়ে যায়, পণ্য যেতে না পারে তাহলে রপ্তানিও কমবে। সবশেষে তিনি বলেন, সাধারণভাবে শ্লথ ও দুর্বল বিনিয়োগ-পরিস্থিতির মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসা নতুন ধরনের এ ধাক্কাগুলো অর্থনীতির সাধারণ কাঠামোকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।
এডিপির সংকট: চলতি অর্থবছরের এডিপির পরিমাণ ৫৫ হাজার কোটি টাকা। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারি পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে এর ৩৮ শতাংশ বা ২১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। অতীত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, অর্থবছরের শেষ তিন বা চার মাসে এডিপির ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়। বিশেষ করে, নির্মাণসংক্রান্ত কাজ এ সময়েই হয়।
এডিপির প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন জোরদার হলে গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষ নতুন কাজ পান। এসব এলাকায় অর্থের সরবরাহ বাড়ে। এর ফলে ভোগ চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা দেখা দেওয়ায় এডিপির বাস্তবায়ন নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিনিয়োগের স্থবিরতা অনেক দিন ধরেই। তার পরও প্রবৃদ্ধি বাড়ছিল ভোগ-ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু টানা হরতাল ও সহিংসতার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বাধা পড়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও সংকট বাড়ছে।
নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। প্রতি রাতে কারওয়ান বাজারে সবজিবাহী ১০০ থেকে ১৫০টি ট্রাক আসে। সেই ট্রাক আসা বন্ধ হয়ে গেছে। বাজারে ক্রেতা কম, সরবরাহও নেই। দাম বেড়ে গেছে সব ধরনের পণ্যের। সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির হিসাবে চাল ছাড়া প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের দামই বেড়েছে। অন্যদিকে কিছু কিছু দোকান খোলা থাকলেও বিক্রি অনেক কম। ফলে মুদি দোকানিদের ব্যবসাও প্রায় বন্ধ। কাজ পাচ্ছেন না দিনমজুরেরাও। ফলে সীমিত আয়ের এবং নিম্নবিত্ত ব্যক্তিরাই সবচেয়ে সংকটে পড়ে গেছেন হরতাল ও সহিংসতার ঘটনায়।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, হরতাল ও সহিংসতা দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়বে। তাহলে বিদ্যমান অস্থিরতা ও সহিংসতা হবে অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত।
হরতাল ও সহিংস ঘটনার কারণে অর্থনীতির ওপর তিনভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। প্রথমত, চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম ও যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় আমদানি-রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মূলধনি, মধ্যবর্তী ও কাঁচামাল আমদানি না হলে উৎপাদন ব্যাহত হবে। এতে রপ্তানি কমে যাবে। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। তৃতীয়ত, সহিংস ঘটনার কারণে রাস্তাঘাট, সেতুসহ রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে উন্নয়ন খাতের অর্থ স্থানান্তর করতে হবে, যা উন্নয়নের ধারাবাহিকতা টেনে ধরবে।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, টানা হরতাল ও সহিংসতা অর্থনীতির জন্য শুধু উদ্বেগজনক নয়, শঙ্কাজনকও। এ ধরনের ঘটনা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিপর্যস্ত অর্থনীতি: ১৩ মাসের মধ্যে শেয়ারবাজারে সূচকের সর্বোচ্চ পতন হয়েছে গত রোববার। চট্টগ্রামের সমুদ্রবন্দরে আমদানি-রপ্তানির পণ্য আটকা পড়ে গেছে। ঢাকায় আসতে পারছে না কোনো কৃষিপণ্য। শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কাজ পাচ্ছেন না দৈনন্দিন মজুরেরা।
পর্যটনশিল্পও টানা সহিংসতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। আটকা পড়েছেন পর্যটকেরা। আবার প্রচুর সাধারণ মানুষের সহায়-সম্পত্তি বিনষ্ট হয়েছে, আগুনে পুড়ে গেছে। এসব ক্ষেত্রে কোনো বিমা করা হয় না। ফলে চলতি খরচ বা সঞ্চয় ভেঙে ঘরবাড়ি তৈরি করতে হবে। এর ফলেও এসব মানুষের ভোগের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।
এমনিতেই তৈরি পোশাক খাত নিয়ে চলছে নানা সংকট। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিশেষ অগ্রাধিকারমূলক বাজার-সুবিধা বা জিএসপি বাতিলের হুমকির মধ্যে আছে। তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডে ১১১ জন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা এখনো সামাল দেওয়া যায়নি। পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের কারণে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের ফলে ভাবমূর্তির সংকটেও আছে দেশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন সংকট।
বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, চলমান সহিংসতায় ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত ও অসহায়। পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। পণ্যবাহী ট্রাক থামিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোথায় ট্রাক আটকা পড়ল, সারা দিন খোঁজ নিয়েও জানা যাচ্ছে না। চট্টগ্রামে পণ্য আটকা পড়ায় কনটেইনার-জট লেগে গেছে। সময়মতো পণ্য রপ্তানি করা যাবে কি না, তা বোঝা যাচ্ছে না। এ রকম এক অসহনীয় পরিবেশে রপ্তানির বাজার ধরে রাখা নিয়েই শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিজিএমইএর সভাপতি আরও বলেন, একটা দেশের অর্থনীতি এভাবে চলতে পারে না। রাজনীতি সব সময়ই অর্থনীতির পরিপূরক। সুতরাং, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে অর্থনীতিও চলবে না। এর অবসান হতে হবে।
স্থবির বিনিয়োগ: অর্থনীতির তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রায় সবগুলো সূচকই ছিল নিম্নমুখী। যেমন, চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) আমদানি ব্যয় কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ। অথচ আগের বছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১৭ শতাংশ।
আবার চলতি অর্থবছরের একই সময়ে নতুন ঋণপত্র (এলসি) স্থাপনা ও নিষ্পত্তি কমেছে যথাক্রমে সাড়ে ৬ শতাংশ ও প্রায় ১১ শতাংশ। নতুন এলসি স্থাপনার ক্ষেত্রে ভোগ্যপণ্য ও মূলধনি পণ্যের আমদানি বাড়লেও পেট্রোলিয়াম পণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, এলসি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ভোগ্যপণ্য, মূলধন পণ্য, পেট্রোলিয়াম এবং শিল্পের কাঁচামালের আমদানি কমে গেছে। এর মধ্যে মূলধন পণ্যে এলসি নিষ্পত্তি কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ এবং শিল্পের কাঁচামালে কমেছে সাড়ে ৫ শতাংশ। এ তথ্য থেকেও বিনিয়োগ স্থবিরতার একটি চিত্র পাওয়া যায়।
তবে রপ্তানির চিত্রটি ছিল তুলনামূলকভাবে ভালো। বিশেষ করে, বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার কারণে আশঙ্কার তুলনায় রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব কম। চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। আবার জানুয়ারি মাসেই রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১৯ শতাংশ। যদিও আগের বছরের একই সময়ে (জুলাই-জানুয়ারি) রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ দশমিক ২৮ শতাংশ।
অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কা: চলতি অর্থবছরের শুরু থেকেই সবচেয়ে দুর্বল জায়গা ছিল বিনিয়োগ। ব্যক্তি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এটি বেশি প্রযোজ্য। গত ছয় মাসে ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগসংক্রান্ত সব সূচকে প্রবৃদ্ধি কমেছে। যেমন, ব্যক্তি খাতে ঋণ ও আমদানি। এর প্রভাব হিসেবে সাধারণভাবে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমার যে আশঙ্কা ছিল, সেটি এখন আরও জোরদার হচ্ছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ গবেষক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সামগ্রিক বিষয় নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, এ রকম এক পরিস্থিতির ভেতরে যদি ধারাবাহিকভাবে সবকিছু বন্ধ থাকে, তাহলে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে উৎপাদকেরা পণ্য বিক্রি করতে পারবেন না, অথচ ক্রেতাদের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এতে উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই সময়ে যদি আবার কাপড়ভর্তি ট্রাক পুড়ে যায়, পণ্য যেতে না পারে তাহলে রপ্তানিও কমবে। সবশেষে তিনি বলেন, সাধারণভাবে শ্লথ ও দুর্বল বিনিয়োগ-পরিস্থিতির মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসা নতুন ধরনের এ ধাক্কাগুলো অর্থনীতির সাধারণ কাঠামোকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।
এডিপির সংকট: চলতি অর্থবছরের এডিপির পরিমাণ ৫৫ হাজার কোটি টাকা। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারি পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়েছে এর ৩৮ শতাংশ বা ২১ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। অতীত অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, অর্থবছরের শেষ তিন বা চার মাসে এডিপির ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়। বিশেষ করে, নির্মাণসংক্রান্ত কাজ এ সময়েই হয়।
এডিপির প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন জোরদার হলে গ্রামীণ অঞ্চলের মানুষ নতুন কাজ পান। এসব এলাকায় অর্থের সরবরাহ বাড়ে। এর ফলে ভোগ চাহিদাও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা দেখা দেওয়ায় এডিপির বাস্তবায়ন নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
collection from prothom alo