Sunday, March 10, 2013

ইফ ইউ হেজিটেট ইউ লুজ



ইউ হেজিটেট ইউ লুজতুমি যদি দ্বিধা করো, তা হলেই তুমি হেরে যাবেআট বছর আগে বহু কষ্ট করে জোগাড় করা এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারের অনেকখানিই এখন ভুলে গিয়েছিখানিকটা বেরিয়েছে ছাপার অক্ষরেখানিকটা হয়তো কোনও ডিজিটাল টেপ রেকর্ডারের খাঁজে মমি হয়ে গিয়েছেকিন্তু এ কথাটা কোথাও লেখা থাকুক না থাকুক, ফুল ফুটুক না ফুটুক, আমার মনে থেকে যাক অবিরাম! থেকে যাবে!
তখন আনন্দবাজারে ভরপুর চাকরি করিউগো চাভেস কলকাতায়সম্পাদক মহাশয়ের কেন যেন মনে হয়েছিল, এ সাক্ষাৎকার আমিই নেব, নিতে পারব! কিন্তু আমার তো পা ভাঙা, ছুটিতে আছি, ক্রাচ নিয়ে হাঁটছিইত্যাদিআরে পারবি, ঠিক পারবি,’ বলেছিল আনন্দবাজারের আর এক স্টার রিপোর্টার, আমার এক কালের প্রতিবেশীবিষয়কে যদি ভালবাসিস, জার্নালিজমকে যদি ভালবাসিস, ক্রাচ-টাচ কোনও ব্যাপারই নাধুউউর
ব্যস, চোখে ঝিলমিল লেগে গেলএক পা ভাঙুক আর দুই, সাক্ষাৎকার আমি নিয়েই ছাড়ব
তার পর কত কাঠখড় পুড়িয়ে সেই সাক্ষাৎকারের টাইম বের করা গিয়েছিল, সে ইতিহাসে আর যাচ্ছি নামোদ্দা কথা, ঠিক হল, উনি এয়ারপোর্ট-এ বেরনোর আগে বাইপাসের এক পাঁচতারাতে দেখা হবে
সময় মতো পৌঁছে গেলাম
কিন্তু গিয়ে শুনি এক ঘণ্টা আগে বেরিয়ে গেছেনতার মানেটা কী? ইন্টারভিউ হবে না? খোঁড়া পায়ে জার্নালিজম-এর জন্য শহিদহওয়া বাতিল? ভেঙে পড়ি আর কী!আবার কাকুতিমিনতিকার যেন দয়া হলকোনও এক সরকারি অফিসারের গাড়িতে করে পাঠিয়ে দেওয়া হল এয়ারপোর্টআপাতত ওখানেই অপেক্ষা
প্রায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর দোভাষীর সঙ্গে যিনি এলেন, আমেরিকানরা তাঁর নাম দিয়েছেকালো বাঁদর’ (আজ্ঞে হ্যাঁ, শোনা যায়, খুব রেগে গেলে চাভেসকে আমেরিকানরা এই নামেই ডাকতেন)
বাঁদর তো বোঝা গেল, রাগের নাম! কিন্তু কালো কেন? দিব্যি ফরসা, সুন্দর খেলোয়াড়ি চেহারাদেখলেই মালুম হয়, এক কালে প্যারাট্রুপার ছিলেনখুব দাপুটে, কিন্তু সব সময় একটা ছটফটে ভাবমনে হবে, এত-শত প্রোটোকলের আড়ালে একটা ছেলেমানুষি ধরে রেখেছেন সর্বাঙ্গে
উগো চাভেসের ছেলেমানুষির গল্পের কোনও অভাব নেইযখন যে দেশে যেতেন, লোকজন অবাক হয়ে দেখত প্রেসিডেন্ট এমন হয়! বিশেষ করে যে সব জায়গায় মানুষ আচরণে একটু বেশি সংযমী, আর মন্ত্রী-সান্ত্রিরা তো বেজায় রাশভারী, সেখানেও চাভেস নিজের মতোযে রাস্তা দিয়ে তাঁর গাড়ি যায়, তার দুধারে মানুষ ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকে, তিনি থেকে থেকেই নেমে পড়ে এগিয়ে যান, হাত মেলান দর্শকদের সঙ্গেবেজিংয়ে যে বাড়িতে তাঁকে থাকতে দেওয়া হয়েছিল, তার ভেতরে প্রশস্ত বাগান, চমৎকার সরোবরফলে তাঁর দেহরক্ষীরা মহা বিপদে পড়লেনকারণ, চাভেস কারও কোনও কথা শোনেন না, ইচ্ছে হলেই বাগানে হাঁটতে বেরিয়ে পড়েন, সরোবরের ধারে জগিং করে তিনি মহা খুশিআর চিনের প্রাচীর দেখার সময় তো তাবৎ প্রোটোকল, সমস্ত সফরসঙ্গী, নিরাপত্তারক্ষীদেরও পিছনে ফেলে ধাঁ দৌড়ওরে থামা, থামা! প্রেসিডেন্টকে কে থামাবেএক বার জাপানে না কোথায় সদ্য-আলাপ-হওয়া এক মন্ত্রী কিংবা অফিসারের চোখ টিপে ধরেছিলেন পিছন থেকে, মজা করে বলুন তো কে আমিগোছের ব্যাপার আর কীভেনেজুয়েলার মানুষ নাকি সচরাচর এই রকমই হয়ে থাকেন, দিলদরিয়া, খোলামেলা
এখানেও তো, রাজারহাটের গ্রামে গিয়ে দুম করে খেতে বসে গেলেন সবার মধ্যেএমন প্রেসিডেন্ট সত্যি-ই আগে দেখিনিসমস্ত প্রোটোকল ছাপিয়ে কোথায় যেন মানুষ চাভেস বেরিয়ে আসছেন সব সময়স্বতঃস্ফূর্ত, আবেগপ্রবণদাপুটে কিন্তু আন্তরিক,” গাড়িতে লিফ্টদেওয়ার সময় জানিয়েছিলেন সরকারি অফিসার
আমি অবশ্য দাপটটের পেলাম শুরুতেইজিজ্ঞাসা করেছিলাম, “আপনি বুশের সঙ্গে টক্কর দিচ্ছেন, কিন্তু আমেরিকাকে আটকাবার মতো সামরিক শক্তি, পরমাণু অস্ত্র আছে আপনাদের?” খুব এক চোট হাসলেনযেন না বুঝে কী একটা বলে ফেলেছিআপনারাও তো ব্রিটিশদের হটিয়েছিলেনসেটা কি অস্ত্রের জোরে?” তার পর বললেন, “অনেক দিন আগে লাতিন আমেরিকার মানুষ যুদ্ধ করে স্পেনীয় সাম্রাজ্যবাদকে লাতিন আমেরিকা থেকে উৎখাত করেছিলতাদের কিন্তু স্প্যানিয়ার্ডদের মতো সামরিক শক্তি ছিল নাপ্রায় দুশো বছর আগে লাতিন আমেরিকার মুক্তিদাতা সাইমন বলিভার বলেছিলেন ‘when you hesitate you loose.’ আমি মনে করি, এটাই লাতিন আমেরিকার আত্মার মূল কথাযে কোনও যুদ্ধে জিততে হলে অস্ত্রই শেষ কথা নাভিয়েতনামের কথা ভাবুনআমাদের আসল অস্ত্র আমার দেশের, আমার মহাদেশের মানুষ
আপনি কি সোশালিস্ট?’
শুনুন, আমি রেভলিউশনে বিশ্বাস করিতবে এক নতুন ধরনের বিপ্লব, যার সঙ্গে গণতন্ত্রের কোনও বিরোধ থাকবে নাআমি মনে করি রেভলিউশনারি ডিমক্র্যাসি, এটাই আজকের নতুন পথমনে রাখতে হবে আজকের দুনিয়ায় কেউই কারও মডেল হতে পারে নাচিন, সোভিয়েত, চে গেভারা, কেউই আমার মডেল নাআর সমাজতন্ত্রের কথা যদি বলেন তা হলে আমি বলব আমি খ্রিস্টানস্বয়ং যিশু খ্রিস্ট সোশালিস্ট ছিলেনআমি তাই অবশ্যই সোশালিস্ট
শুনেছিলাম প্রেসিডেন্ট চাভেসকে এক বার সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে বন্দি করে অন্য এক জনকে প্রেসিডেন্ট করা হয়েছিলতার পর লক্ষ লক্ষ লোক রাষ্ট্রপতি ভবন অবরোধ করেএক ঘণ্টার নোটিস দেয় নতুন রাষ্ট্রপতিকে: চাভেজকে মুক্তি দাও, নয়তো তোমাকেই শেষ করবসত্যি, না গল্প? ওঁর মুখ থেকে শুনতে চাইছিলামবললেন: আরে সে খুব মজার গল্পঘুম ভেঙে দেখি আমার চার পাশের গার্ডের চেহারা পাল্টে গিয়েছেআমি তো ভাবলাম স্বপ্ন দেখছিতার পর হঠাৎ চার পাশের বৃত্তটা ছোট হয়ে এল আর বন্দুকধারী নতুন রক্ষীরা বলল, আপনি ক্ষমতাচ্যুত, আপনাকে গ্রেফতার করা হয়েছেতার পর আমায় হেলিকপ্টারে কোথায় একটা নিয়ে গিয়ে বলল, পিছন ঘুরে দাঁড়াওবুঝলাম ফায়ারিং স্কোয়াডমৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভাবলাম, মানুষের জন্য এত কিছু করলাম, পাশে থাকলাম, এত বিশ্বাস রাখলামতারা কোথায়? তার পর তো দাঁড়িয়ে আছি, গুলি আর চলে নাশুনি গার্ডদের মধ্যে কী নিয়ে যেন ধুম ঝগড়া হচ্ছেহঠাৎ কয়েক জন গার্ড আমায় ঘিরে ধরে বাকিদের বলতে লাগল, “একে যদি তোমরা গুলি কর, তা হলে আমরা তোমাদের গুলি করবতার পর দেখি একটি হেলিকপ্টার এসে থামলআমি ভাবলাম, এ বার হয়তো আমেরিকা উড়িয়ে নিয়ে যাবে কিন্তু হেলিকপ্টার দেখি কারাকাসে আমার প্রাসাদের দিকে এগোচ্ছেহাজার হাজার নিরস্ত্র মানুষ সেই প্রাসাদ ঘিরে রেখেছেবললাম না? যুদ্ধ জেতার জন্য সব সময় অস্ত্রের দরকার পড়ে নাপরে শুনলাম সেদিন কারাকাসের মানুষ বলেছিল, এই প্রাসাদ আমার
কারাকাসের প্রাসাদ ছেড়ে অনেক দূরের দেশে যাত্রা করেছেন চাভেসসে দেশে অভ্যুত্থান, অবরোধ, দাদাগিরি কিছুই চলে কি না, জানা নেই কারওচলুক না চলুক, জীবনের যে কোনও ছোট বড় লড়াইয়ে চোখের মণি চাভেসযে সময় কখনও অতীত হয় না, তার ছায়া হয়ে চাভেস বলে চলবেন, ‘ইফ ইউ হেজিটেট ইউ লুজ
manabzamin